Skip to content
Independent. Investigative. In the public interest.
LoginRegisterJoin the newsroom EN বাংলা
JulyTimes
Newsletter

বাংলাদেশে ইয়েলো জার্নালিজম: সংকট ও সংস্কারের অগ্নিপরীক্ষা

গণমাধ্যম একটি জাতির দর্পণ। সত্য ও নিরপেক্ষতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সাংবাদিকতা সমাজের বিবেক জাগ্রত করে, শোষণের বিরুদ্ধে রণভেরী হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন এই দর্পণ বিকৃত আয়নায় পরিণত হয়, তখন তা বাস্তবতাক...

Reader tools
বাংলাদেশে ইয়েলো জার্নালিজম: সংকট ও সংস্কারের অগ্নিপরীক্ষা

গণমাধ্যম একটি জাতির দর্পণ। সত্য ও নিরপেক্ষতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সাংবাদিকতা সমাজের বিবেক জাগ্রত করে, শোষণের বিরুদ্ধে রণভেরী হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন এই দর্পণ বিকৃত আয়নায় পরিণত হয়, তখন তা বাস্তবতাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম আজ সেই বিকৃতির এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। তথ্যের চেয়ে আলোকচিত্রের আড়ম্বর, শিরোনামের চটক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবতাকে গ্রাস করছে—এই অসুস্থতাকেই ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ বা ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ বলা হয় ।

ইয়েলো জার্নালিজমের সংজ্ঞা ও প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি একেএম আবদুল হাকিমের ভাষায়, “যখন বিকৃত ও অতিরঞ্জিত সংবাদ সৃষ্টি করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা হয়, তখন তাকে ইয়েলো জার্নালিজম বলে” । শুধু ভুল তথ্য নয়, এটি আংশিক সত্যের সাথে মিথ্যা মিশিয়ে, ঘটনার প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে সংবাদ উপস্থাপনের নাম । বাংলাদেশে এই ধারার সাংবাদিকতা নতুন নয়; ১৯৭৪ সালে কুড়িগ্রামের মানসিক প্রতিবন্ধী নারী বাসন্তী বালাকে জাল জালিয়ে ‘দুর্ভিক্ষের প্রতীক’ বানানো ছিল এর প্রথম পরিচিত রূপ ।

রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও মিডিয়ার অন্ধকার অধ্যায়

বাংলাদেশে ইয়েলো জার্নালিজমের মূল বিষবাষ্প রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬০% টিভি চ্যানেলে সরকারপন্থী পক্ষপাত বিদ্যমান। ২০২৪ সালের নির্বাচনী কাভারেজে ৭৮% সংবাদ ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে ছিল, যা বিরোধী মতকে সম্পূর্ণরূপে চেপে রাখার প্রচেষ্টা ।

নির্দিষ্ট পত্রিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও গভীর। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে ‘ইসলামোফোবিক ইয়েলো জার্নালিজমের পথিকৃৎ’ আখ্যা দিয়েছেন । তার বিবৃতিতে অভিযোগ, ধর্ষণের সংবাদে সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আসামিদের পরিচয় গোপন করে মুসলিম আসামিদের ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরা হয়—এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রকল্পের অংশ ।

মালিকানা স্বার্থে সত্য বিকৃতি: হলি আর্টিজান মিথ

ইয়েলো জার্নালিজমের সবচেয়ে পরিষ্কার ও বিতর্কিত উদাহরণ ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার ঘটনা। প্রথম আলোর মালিকানাধীন ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যানের নাতি ফারাজ আয়াজ হোসেনকে ‘নায়ক’ বানানোর জন্য বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ বিকৃত করা হয় । প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন, বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য কিংবা আদালতে দাখিলকৃত চার্জশিটে ফারাজের বীরত্বের কোনো প্রমাণ নেই। অথচ গণমাধ্যমে গল্প সাজিয়ে, মতামত কলাম লিখিয়ে ও পরবর্তীতে ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে একটি মিথকে ‘ইতিহাস’ বানানোর অপচেষ্টা করা হয় ।

আন্তর্জাতিক প্রোপাগান্ডা ও স্বাধীনতার নামে অপপ্রচার

দেশের সীমানা পেরিয়ে ইয়েলো জার্নালিজম এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ভারতীয় গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যুতে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে । সাংবাদিক নেতাদের মতে, এই অপপ্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করার চক্রান্ত চলছে, যার পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ইন্ধন রয়েছে বলে তারা মনে করেন ।

গণবিশ্বাসের সংকট ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি

এই অসুস্থ সাংবাদিকতার ফলাফল সুদূরপ্রসারী। ২০২৪ সালের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৩তম, যা আমাদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার করুণ চিত্র তুলে ধরে । জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট আরও প্রকট; মাত্র ২৮% বাংলাদেশী মূলধারার গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করেন, অথচ ৬২% মানুষ সাপ্তাহিকভাবে ভুয়া সংবাদের সম্মুখীন হন ।

সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমীন সোনেয়া মুর্শিদ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “সুস্থ সাংবাদিকতা চর্চায় পাঠক নিরপেক্ষতা আশা করেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দেশে হলুদ সাংবাদিকতার প্রবণতা বাড়ছে” । এই বক্তব্য সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকেও সমস্যার গুরুত্ব স্বীকারের বহিঃপ্রকাশ।

উপসংহার: উত্তরণের পথ

বাংলাদেশের গণমন্ত্র আজ সংকটে। রাজনৈতিক দল, মালিকস্বার্থ ও আদর্শিক এজেন্ডার চাপে সাংবাদিকতার বিবেক বারবার বিপর্যস্ত হচ্ছে। বাসন্তী বালার প্রতারণা থেকে শুরু করে ফারাজ আয়াজের পৌরাণিক কাহিনি—একই পথপরিক্রমায় আমরা বারবার ইতিহাসকে বিকৃত করেছি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কোনো বিকল্প পথ নেই। প্রেস কাউন্সিলের কোড অব কন্ডাক্ট কঠোরভাবে অনুসরণ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নামে অপসংস্কৃতি বর্জন, এবং সর্বোপরি সাংবাদিকদের নৈতিকতার অঙ্গীকার অপরিহার্য। নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তখনই সার্থক হবে, যখন গণমাধ্যম ‘ক্ষমতার চাটুকার’ না হয়ে ‘সত্যের বার্তাবাহক’ হিসেবে নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবে । হলুদ সাংবাদিকতা নয়, দেশ এখন দাবি করে স্বচ্ছ, সত্যনিষ্ঠ ও দায়বিশ্ব সাংবাদিকতা।

Request a correction or reply
1reading now