Skip to content
Independent. Investigative. In the public interest.
LoginRegisterJoin the newsroom EN বাংলা
JulyTimes
Newsletter

নাগরিকের ক্যামেরা বনাম হলুদ কলম: বাংলাদেশে সিটিজেন জার্নালিজমের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ আজ গণমাধ্যমের ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। একসময় যেখানে সংবাদ পরিবেশনের একচেটিয়া অধিকার ছিল পেশাদার সাংবাদিকদের হাতে, সেখানে এখন সাধারণ নাগরিকরাই মোবাইল ফোনের ক্যামেরা আর ইন...

Reader tools
নাগরিকের ক্যামেরা বনাম হলুদ কলম: বাংলাদেশে সিটিজেন জার্নালিজমের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ আজ গণমাধ্যমের ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। একসময় যেখানে সংবাদ পরিবেশনের একচেটিয়া অধিকার ছিল পেশাদার সাংবাদিকদের হাতে, সেখানে এখন সাধারণ নাগরিকরাই মোবাইল ফোনের ক্যামেরা আর ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে হয়ে উঠছেন সংবাদের উৎস ও পরিবেশক। এই ধারার নামই ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বা ‘নাগরিক সাংবাদিকতা’। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও গণতান্ত্রিক দেশে এই ধারার সম্ভাবনা যেমন অপরিসীম, তেমনি এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ (Yellow Journalism) নামক এক ভয়াবহ সংকট। এই প্রবন্ধে আমরা বাংলাদেশে সিটিজেন জার্নালিজমের বিস্তার, এর সম্ভাবনা এবং কীভাবে এটি হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তা বিশ্লেষণ করব।

বাংলাদেশে সিটিজেন জার্নালিজমের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ যেখানে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটিরও বেশি, আর মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী প্রায় ১৮ কোটি। এর মধ্যে স্মার্টফোনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো এখন তথ্য আদান-প্রদানের প্রধান কেন্দ্র। কোটা সংস্কার আন্দোলন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা, নদী দূষণ, দুর্নীতির ঘটনা—যে সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় প্রচলিত গণমাধ্যম পিছিয়ে পড়েছে, সেখানে প্রথম আপডেট এসেছে সাধারণ নাগরিকদের তোলা ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে। এটাই সিটিজেন জার্নালিজমের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রমাণ।

সিটিজেন জার্নালিজমের সম্ভাবনা

১. গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা: সিটিজেন জার্নালিজম সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো, এটি ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনে। বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, অবকাঠামো উন্নয়নের অনিয়ম বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জুলুমের ছবি বা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। এটি প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের একটি কার্যকর হাতিয়ার।

২. প্রত্যন্ত অঞ্চলের কণ্ঠস্বর: প্রচলিত গণমাধ্যম প্রধানত ঢাকা ও বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক। কিন্তু সিটিজেন জার্নালিজমের মাধ্যমে চট্টগ্রামের পাহাড়, সিলেটের হাওর বা উত্তরবঙ্গের চরের সাধারণ মানুষ তাদের সমস্যা, সংস্কৃতি ও দাবি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারেন। এটি স্থানীয় সংবাদের গুরুত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।

৩. দ্রুত সংবাদ সংগ্রহ: বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনায় সাংবাদিকদের পৌঁছাতে সময় লাগে। কিন্তু ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ নাগরিক তাৎক্ষণিকভাবে ভিডিও ধারণ ও সম্প্রচার করতে পারেন। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সময় সাধারণ মানুষই প্রথম দৃশ্য ধারণ করে সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠানকে সচেষ্ট করতে সক্ষম হন।

৪. বিকল্প আখ্যান গঠন: মূলধারার গণমাধ্যম কখনও কখনও নির্দিষ্ট স্বার্থ বা রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিচালিত হয়। সিটিজেন জার্নালিজম সেই আখ্যানকে চ্যালেঞ্জ করে আরও বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করে।

হলুদ সাংবাদিকতা: বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট

হলুদ সাংবাদিকতা বলতে বোঝায় সংবেদনশীলতা, অতিরঞ্জন, বিভ্রান্তিকর শিরোনাম এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই সংবাদ পরিবেশন। বাংলাদেশের কিছু টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল ও সোশ্যাল মিডিয়া পেজে এই প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সম্প্রচারমাধ্যমের তীব্র প্রতিযোগিতায় ‘টিআরপি’র (টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট) পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকে রটনা, গুজব ও ভিত্তিহীন তথ্যকে সংবাদ আকারে পরিবেশন করছে। ‘ক্যাপ্টেন খোকা’ থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অপতথ্য—হলুদ সাংবাদিকতা বারবার দেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সিটিজেন জার্নালিজমের কার্যকারিতা

সিটিজেন জার্নালিজম হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর? এর উত্তর ইতিবাচক হলেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

কার্যকারিতা:

ক. ভুয়া সংবাদ উন্মোচন: হলুদ সাংবাদিকতার একটি প্রধান অস্ত্র হলো ভুয়া বা সম্পাদিত ছবি ও তথ্য। সিটিজেন জার্নালিস্টরা ঘটনাস্থল থেকে প্রকৃত তথ্য ও ফুটেজ সরবরাহ করে সেই মিথ্যাকে ভাঙতে পারেন। যেমন, একটি মিথ্যা সংবাদ দাবি করলো যে সড়ক দুর্ঘটনায় শতাধিক নিহত হয়েছে; কিন্তু ঘটনাস্থলের নাগরিকের তোলা ভিডিওতে দেখা গেল প্রকৃত সংখ্যা মাত্র পাঁচ। এটি হলুদ সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে।

খ. যাচাইকরণে সহায়তা: পেশাদার ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো এখন সিটিজেন জার্নালিস্টদের সরবরাহ করা তথ্যের ওপর নির্ভর করে ভাইরাল হলুদ সংবাদ যাচাই করে। বাংলাদেশে ‘বুম বাংলাদেশ’, ‘রিউমার স্ক্যানার’ বা ‘ফ্যাক্টওয়াচ’-এর মতো উদ্যোগগুলো নাগরিকদের পাঠানো তথ্য ও ক্লেইম পরীক্ষা করে হলুদ সাংবাদিকতার প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।

গ. জনমাধ্যমের জবাবদিহিতা: যখন কোনো প্রচলিত গণমাধ্যম হলুদ সাংবাদিকতা করে, তখন সিটিজেন জার্নালিস্টরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে ট্রেন্ডিং করাতে পারেন। এর ফলে বিজ্ঞাপনদাতা ও সাধারণ দর্শক সেই মাধ্যমকে বয়কট করতে পারে, যা আর্থিক ক্ষতির মাধ্যমে হলুদ সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করে।

ঘ. সংবাদের উৎসের বৈচিত্র্য: হলুদ সাংবাদিকতা সাধারণত কিছু স্টেরিওটাইপ বা এজেন্ডা ঘিরে আবর্তিত হয়। সিটিজেন জার্নালিজম স্থানীয়, বৈচিত্র্যময় ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে এই একচেটিয়া আখ্যান ভাঙতে সক্ষম।

সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ:

তবে, একথাও সত্যি যে সিটিজেন জার্নালিজম নিজেই হলুদ সাংবাদিকতার শিকার হতে পারে। কারণ সাধারণ নাগরিকদের অনেকেরই সাংবাদিকতার নৈতিকতা, তথ্য যাচাইয়ের কৌশল বা আইনি জটিলতা সম্পর্কে ধারণা নেই। তারা নিজেরাও অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়াতে পারেন। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময় ভাইরাল অনেক ভিডিও পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, যা গুজবকে আরও উসকে দিয়েছে। তাই বলা যায়, সিটিজেন জার্নালিজম হলুদ সাংবাদিকতার জন্য একটি কার্যকর প্রতিষেধক হতে পারে, কিন্তু তাও প্রয়োজন সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতার বোধ।

প্রয়োজনীয় করণীয়

বাংলাদেশে সিটিজেন জার্নালিজমকে হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ জরুরি:

১. ডিজিটাল লিটারেসি বৃদ্ধি: স্কুল-কলেজ ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকদের তথ্য যাচাই ও নৈতিক সাংবাদিকতার পাঠ দিতে হবে।

২. প্রশিক্ষণ ও প্ল্যাটফর্ম: গণমাধ্যম গবেষণা বিভাগ ও বেসরকারি সংস্থাগুলো ফ্রি অনলাইন কোর্স ও স্থানীয় কর্মশালার মাধ্যমে নাগরিক সাংবাদিকদের দক্ষ করে তুলতে পারে।

৩. আইনি কাঠামো ও সুরক্ষা: সিটিজেন জার্নালিস্টদের হয়রানি ও আইনি জটিলতা থেকে রক্ষার জন্য একটি বন্ধুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো তৈরি প্রয়োজন। একই সাথে হলুদ সাংবাদিকতার জন্য কঠোর আইনি দণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।

৪. সহযোগিতা: প্রচলিত গণমাধ্যম ও সিটিজেন জার্নালিস্টদের মধ্যে সম্মানজনক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। যেমন, কোনো সংবাদে নাগরিকের ফুটেজ ব্যবহার করলে তাকে কৃতিত্ব দেওয়া এবং তার তথ্য যাচাইয়ে সাহায্য করা।

সিটিজেন জার্নালিজম পেশা নয়, এটি নৈতিক দায়িত্ব—এই ধারণা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। হলুদ সাংবাদিকতা যখন তথ্যের বিষবৃক্ষ রোপণ করে, তখন সাধারণ নাগরিকের হাতে থাকা স্মার্টফোন হতে পারে সেই বৃক্ষ কর্তনের ধারালো কুঠার। কিন্তু এই কুঠারটি যেন নিজেও অনিয়ন্ত্রিত না হয়ে ওঠে, সেজন্য প্রয়োজন নিয়ম, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ। বাংলাদেশের মতো একটি কণ্ঠস্বর-সচেতন দেশে সিটিজেন জার্নালিজমের সম্ভাবনা অপার। সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আইনি সুরক্ষা পেলে এটি একদিন হলুদ সাংবাদিকতাকে কেবল নয়, বরং পুরো সংবাদমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক করে তুলতে পারে। নাগরিকের ক্যামেরা যদি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কাজ করে, তবে হলুদ কলমের কালি আর কখনো সংবাদের পবিত্রতা নষ্ট করতে পারবে না।

Request a correction or reply
1reading now